শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:০৮ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল চরমধূয়া সাম্প্রতিককালে হয়ে উঠেছে অশান্ত। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শান্ত এই জনপদ অশান্ত হয়ে ওঠে। বর্তমানে আতঙ্কের এক জনপদ চরমধূয়া।
অভিযোগ উঠেছে, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে এলাকায় খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মহোৎসব চলছে। একটি হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অন্তত ৩০টি পরিবার।নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নদীবেষ্টিত এক সময়ের শান্ত চরমধূয়া ইউনিয়ন বর্তমানে এক মূর্তিমান আতঙ্ক আর অশান্ত জনপদের নাম। খুন, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অর্থ আদায়, ধর্ষণ সহ মাদক ও অস্ত্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে উপজেলার দুর্গম এই চরাঞ্চল।
চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি চরমধূয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিনের ছোট ভাই কামরুল ও শ্রমিকলীগ নেতা আমান উল্লার নেতৃত্বে ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামে রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসামিপক্ষের লোকজনের বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ সহ একাধিক পরিবারের লোকজনকে মারধর ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, চরমধূয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিনের আশীর্বাদ পুষ্ট হয়ে একাধিক মামলার আসামী স্থানীয় শ্রমিক লীগ নেতা শীর্ষ সন্ত্রাসী আমান উল্লাহ আমান ও তার বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় এসকল অপকর্ম করে আসলেও প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে।
আর এই শীর্ষ সন্ত্রাসী আমান উল্লাহ’র অস্ত্র কেনার অর্থের যোগানদাতা হিসেবে উঠে এসেছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিন ও তার ছোট ভাই কামরুলের নাম। এই কামরুল বিভিন্ন স্থানে থানা যুবদলের যুগ্ন আহবায়ক পরিচয় দিয়ে আসলেও রায়পুরা থানা যুবদলের কমিটিতে তার কোন নাম নেই। এমনটাই জানায় রায়পুরা থানা যুবদলের আহ্বায়ক আলফাজ উদ্দিন মিঠু।
ভুক্তভোগী আসমা বেগম জানান,
“আমানুল্লাহর নেতৃত্বে একদল যুবক হঠাৎ আমাগো বাড়িতে হামলা চালায়। ঘরের সবকিছু ভাইঙা ফালাইছে, মায়েরে মারধর করছে। এসময় ঘরে থাকা ৭০ হাজার টাকাও নিয়া যায় তারা। আমরা এখন কই যামু?”
অনুসন্ধানে জানা যায়, রফিকুল হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িঘর ছাড়াও এলাকার নিরীহ মানুষের ওপর চলছে জেল-জুলুমসহ অমানবিক নির্যাতন। জসিম উদ্দিনের ইশারায় আমানুল্লাহ বাহিনী অন্তত ৫ থেকে ৬টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং ৩০টি পরিবারের ঘরের মালামালসহ গরু-বাছুর লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। শুধু তাই নয় এ সময় এক গৃহবধূ ও এক তরুণীর শ্লীলতাহানির ঘটনাও ঘটায় তারা। ক্যামেরার সামনে কথা না বলা শর্তে ওই দুই ভুক্তভোগি এমনটা জানায়।
আর যারা এ সকল অপকর্মের সাথে জড়িত তারা এমনই এক অদৃশ্য শক্তির ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে যার ফলে এদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও মিলছে না প্রতিকার, উল্টো পোহাতে হচ্ছে হয়রানি।
ভুক্তভোগী সুরাইয়া বেগম বলেন,
“আমাগো চারটা গরু নিয়া গেছে, বউবেটিদের স্বর্ণ গয়না নিয়া গেছে। এরপর ঘরে আগুন দিয়া পুড়াইয়া দেয় । আমরা শুধু বিচার চাই আর নিজের ঘরে ফিরতে চাই।”
তবে যার ইশারায় এতকিছু ঘটছে সেই জসিম উদ্দিন নিজেকে একজন সুশীল সমাজের নেতা দাবি করে বলেন, “চরমধূয়া ইউনিয়নকে দুইটি গ্রুপে নিয়ন্ত্রণ করে। এর একটি গ্রুপ চরমধূয়া ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শিকদার নিয়ন্ত্রণ করে এবং অপরটি আমান উল্লাহ নিয়ন্ত্রণ করে। আমার নিজের গ্রামের বাইরে আমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।” তাদেরকে রায়পুরা এবং নরসিংদী যেতে হলে চরমধূয়ার উপর দিয়ে যেতে হয় বিধায় দীর্ঘদিন ধরে চরমধূয়ার লোকজনই তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বলেও জানান তিনি।
অপরদিকে অভিযুক্ত আমান উল্লাহ আমান বলেন, “ভাই আপনিতো এবিষয়ে আগেও নিউজ করছেন। আপনারা লেইখা আমার যা করতে পারেন করেন, আমার কিছু বলার নাই, আর বলবোও না।”
চরমধূয়া ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শিকদার বলেন, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে ইউনিয়নবাসীর ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ আমাকে দেখতে হয়। এ কারণেই হয়তো কোন একটি পক্ষ আমার বিরাগভাজজন হতে পারে। তারাই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে মনে করি।
নরসিংদী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার বলেন, রফিকুল ইসলাম হত্যা মামলার ইতিমধ্যে দুজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মজিবর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এব্যাপারে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে খুব শীঘ্রই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি ভাংচুর,লুটপাট ও তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনারা অবগত আছেন যে চরাঞ্চলে যেকোন ঘটনা ঘটলেই তারা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়।
তখন একটি দল এলাকায় থাকে এবং অপরটি পালিয়ে যায়। এখানেও এর ব্যাত্যয় ঘটেনি।
হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সাধারণ মানুষের জানমালের ওপর এই হামলা চরাঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত করছে।
তাই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিনের খুঁটির জোর চিহ্নিত করে তাকে ও আমান উল্লাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত সহ এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামিয়ে দ্রুত এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনাতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি দাবি প্রতিটি চরাঞ্চলবাসীর।